বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেক ঘনিষ্ঠ। তবে রিপাবলিকানরা নির্বাচনে দুর্বল হলে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভারসাম্য নতুন করে আলোচনায় আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আগ্রহ পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে এই সম্পর্ক ধরে রাখতে ইসলামাবাদকে নিজস্ব কৌশলগত গুরুত্ব প্রমাণ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় পাকিস্তানের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল।
আফগান তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস ছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং জো বাইডেনের শাসনামলেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা উষ্ণ ছিল না।
তবে ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
ওই বছরের মার্চে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে কাবুল বিমানবন্দরে ২০২১ সালের হামলার এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প।
এরপর মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চারদিনের তীব্র সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, তার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তান তার ভূমিকার প্রশংসা করলেও ভারত এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, দুই দেশের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সংঘাত থেমেছিল।
এরপর পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানানো হয়। পাকিস্তানি পণ্যে শুল্ক কমানো হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখে ইসলামাবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে।
মুনিরকে হোয়াইট হাউজে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। পাকিস্তানের কোনো সেনাপ্রধানের জন্য (যিনি একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট নন) এটি ছিল এক বিরল ঘটনা। ট্রাম্প মুনিরকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেও উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার প্রশংসা করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে এই ঘনিষ্ঠতা থেকে ইসলামাবাদ সরাসরি কতটা অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি হয়। এর ফলে পাকিস্তানি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ২৯ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নেমে আসে।
এরপর খনিজ সম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ড্রোন খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়।
ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতেও পাকিস্তানের গুরুত্ব বেড়েছে।
তবে বিশ্লেষক ইমরান খানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক পরিচিতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সরাসরি প্রাপ্তি এখনো সীমিত।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে পাকিস্তান।
৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। পরে ইসলামাবাদে ১৯৭৯ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনার আয়োজন করা হয়।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকেও সম্মতি আসে। তবে পরবর্তী আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা আগস্টের মাঝামাঝি শেষ হলেও তা বাড়ানো হয়নি।
২০ অক্টোবর আবারও তেহরান সফর করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল তার পঞ্চম সফর। তবে সফরে বড় কোনো অগ্রগতির ঘোষণা আসেনি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার ঝুঁকি তৈরি হলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকাও আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এক জরিপে তার জনসমর্থন ছিল ৩০ শতাংশ। জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খানের মতে, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ন্যাটোর মতো চুক্তিভিত্তিক মিত্রজোটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে বেশি মনোযোগী হতে পারে ওয়াশিংটন।
তবে নির্বাচনের ফলের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ২০২৮ বা ২০২৯ সালে হোয়াইট হাউজে ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সমর্থনের বাইরে নিজেদের গুরুত্ব ধরে রাখা।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকার কারণে পাকিস্তান এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
কামার চিমার মতে, ট্রাম্পের প্রভাব বাড়ছে নাকি কমছে, শুধু সেই হিসাব করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি সাজানো উচিত নয়। বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে।
অন্যদিকে, ইমরান খানের মতে, ট্রাম্প দুর্বল হলে স্বল্প মেয়াদে পাকিস্তানের অবস্থানের খুব বেশি পরিবর্তন না-ও হতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ওয়াশিংটনের কাছে দেশটির বর্তমান গুরুত্ব কমতে শুরু করার ঝুঁকি রয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা